পঞ্চগড়ে “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” পঞ্চগড় জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ৫ জয়িতার জীবন সংগ্রামের কাহিনী

আব্দুর রহিম, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি :

(১) তেঁতুলিয়ার উপজেলার মমিন পাড়া মহল্লার জয়নব বেগমের জীবন কাহিনী
সফল জননী যে নারী ঃ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার মমিনপাড়া গ্রামের জম্ম গ্রহন করেন জয়নব বেগম। চার ভাই বোনের মধ্যে জয়নব বেগম তৃতীয়। ১৯৬৬ সালে একই গ্রামের সহরাব আলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি তার বিবাহিত জীবনে সাত কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জম্ম দেন। এক কন্যা ও এক পুত্র শৈশবে মৃত্যু বরণ করেন। অভাব অনটনের সংসারে জয়নব বেগম ১৯৮৬ সালে তেঁতুলিয়া কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের আয়া পদে চাকুরী নেন। ১৯৮৭ সালে পুত্র সন্তানের মৃত্যুতে মারাতœাক ভাবে শোকাহত হয়। ১৯৮৮ সালে স্বামী সোহরাব আলী ও মৃত্যু বরণ করেন। এমতাবস্থায় জয়নব বেগম দুই সন্তান ও স্বামীকে হারানোর পরেও বাকী সন্তানদের চিন্তা করে সকল অপ্রাপ্তিকে মুছে ফেলে অতি মাত্রায় আতœপ্রত্যয়ী হয়ে শুরু করেন এক নতুন সংগ্রাম। সন্তানদের অনুপ্রেরণা যোগাতে থাকেন। অবশেষে জয়নব বেগমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ছয় মেয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেন। সমাজে সন্তানদের অংশগ্রহণ দেখে নিজেকে সফল ও তৃপ্ত জননী হিসেবে মনে করেন এবং ভবিয্যতে তার মেয়ে ও জামাই ও নাতী-নাতনিরা দেশ জাতি ও সমাজের কল্যাণে আরও বেশি কার্যকর অবদান রাখবেন বলে মনের মনি কোঠায় আশা পোষণ করে রেখেছেন এই সফল জননী জয়নব বেগম।#

(২) তেঁতুলিয়ার উপজেলার রনচন্ডি গ্রামের তানজিনা আক্তার বিনতির জীবন সংগ্রামের কাহিনী
নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী ঃ পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার রনচন্ডি গ্রামে জম্ম হয় তানজিনার আক্তার বিনতির। বাবার বাড়ীতে বেশ সুখেই দিন কাটছিল বিনতির। এইচ এস সি পাশ করার পর হঠাৎ করে তার বাবা ভালো পাত্রের সন্ধান পেয়ে ২০১০ সালে ঢাকার মোঃ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে বিয়ে দেয়। বিবাহিত দাম্পত্য জীবনে সুখের বিপরীতে নেমে আসে চরম নির্যাতন। নির্যাতন ও প্রতিকুল পরিবেশের মধ্য থেকেও এক পুত্র সন্তান জম্ম দেন। বিনতি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ২০১২ সালে বাবার বাড়ীতে পাড়ি জমায়। তালাক প্রাপ্ত হয়েও নির্যাতনের বিভাষিকা মুছে ফেলে তেঁতুলিয়া ডিগ্রী কলেজ থেকে ২০১৪ সালে বি.এস.এস. শাখায় ২য় শ্রেণীতে উর্ত্তিন হন। ২০১৫ সালে বেসরকারী সংস্থা আশাতে স্বাস্থ্য প্রোগ্রামে চাকুরী হয়। বর্তমানে সে প্রায় ৫শতাধিক পরিবারে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে। তার পরেও বিনতি লেখা-পড়া চালিয়ে যায়। ২০১৬ সালে দিনাজপুর সরকারী কলেজ থেকে প্রিভিয়ার্স মাস্টার্সে ১ম বর্ষে ২য় শ্রেণীতে উর্ত্তিন হওয়ায় ফাইনাল পরিক্ষার জন্য প্রস্ততি নেয়। বর্তমানে বিনতি চাকুরী করে তার নিজস্ব সম্পদ হিসাবে ২টি গাভি ক্রয় করেছে এবং নিজের লেখা-পড়া চালিয়ে যাচ্ছে। বিনতি ব্যক্তি জীবনে নির্যাতনকে পিছনে ফেলে নিজেকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পেরে সমাজের কাছে নিজেকে সফল নারী হিসেবে মনে করেন। #

(৩)পঞ্চগড় সদর উপজেলার শিংপাড়া(ব্যারিষ্টার বাজার)এলাকার আনজুমান জীবন সংগ্রামের কাহিনী
শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী যে নারী ঃ পঞ্চগড় সদর উপজেলার শিংপাড়া) ব্যারিষ্টার বাজার এলাকার এক হতভাগ্য নারী, আনজুমান। জম্মের দুই বছরেই বাবা মারা যান। স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন দুঃখীনি মা অনেক কষ্টে আমাদের দুই ভাই বোনকে লালন-পালন করতে থাকেন। ছোট ভাইয়ের জম্মের পরে মা আমাকে তার বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে বাধ্য হন। শুরু হয় আমার কষ্টের জীবন। আমার মা স্বল্প মজুরীর বিভিন্ন কাজ করেন এবং চাচাদের সহযোগিতায় আমার পড়া-শুনার খরচ চালান। ক্যালেন্ডার এর পেছনের সাদা অংশকে বাড়ির কাজের খাতা হিসেবে ব্যবহার করতে হতো। তাতে প্রথমে পেন্সিল দিয়ে লেখতাম। আবার মিশিয়ে দিয়ে অন্য পড়া কলম দিয়ে লেখতাম। কোন গাইড বই ও প্রাইভেট কিছুই ছিলনা। এভাবেই এসএসসি পাশ করি। পড়াশুনার খরচ বহনে সমস্যা হওয়ায় চাচারা আমাকে বিয়ে দেন। শুরু হয় আমার সংসার জীবন। কিন্তু কি দুর্ভোগ্য আমার। যৌতুক দেওয়ার সামর্থ আমার মায়ের না থাকায় এ জীবনের শুরু হয় যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ভেবেছিলাম সন্তান জম্ম হলে ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। জম্ম হয় আমার প্রথম সন্তান অনিকের। কিন্তু না কিছুইতেই আমার উপর নির্যাতন বন্ধ হচ্ছিল না। শত নির্যাতনের মাঝেও আমি সংসার করতে থাকি। জম্ম হয় আমার মেয়ের। মেয়ে সন্তান জম্ম হওয়ায় নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। আমাকে মারাতœাকভাবে গুরুতর জখম করেন এবং মৃত্যুর হুমকি দেন। আমার দুঃখিনী মা চাচাদের সাথে নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় আমাকে উদ্ধার করেন। চিকিৎসক ও সেবার মাধ্যমে আমাকে সুস্থ্য করে তুলেদেন। এরই মধ্যে আমার স্বামী ২য় বিয়ে করেন। অধিক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে সংসারে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই আমার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পুনরায় ফিরে আসি মায়ে কাছে। কোন কুল কিনারা না পেয়ে পুনরায় শুরু করি পড়াশুনা। টিউশনি এবং কাপড়ে এমব্রয়ডারী করে চালাচ্ছিলাম পড়াশুনা। এইচএসসি পাশ করি। চাকুরী খুঁজতে গিয়ে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসুচীর সার্কুলার পাই। আবেদন করি,পরীক্ষা দেই এবং নিযোগ পাই। সংসার বিচ্ছিন্ন ও কষ্টভুক্ত জীবনের সামান্য অবসান ঘটে। স্বল্প বেতনের চাকুরী চলাকালীন অবস্থায় আমি ডিগ্রী ও এম,এ পাশ করি। শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে বিনোদনের বিভিন্ন পার্টে আমি অংশগ্রহণ করতাম। পুরুস্কার স্বরপ বেশ কিছু সার্টিফিকেট ও রয়েছে। আমার কষ্টভুক্ত জীবনকে বিধিলিপি বলে আমি মনে করি। লড়াই করেছি জীবনের সঙ্গে। বর্তমানে আমি এল,এল,বি.পড়ছি। তালাকপ্রাপ্ত হয়ে থাকতে অনেক বাধা বিপত্তির সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু আমি থেকে যাচ্ছি না। সকল বাধা অতিক্রম করে চালিয়ে যাচ্ছি আমার পড়াশুনা। পাশাপাশি আমার সন্তাদের পড়াশুনাও চালাচ্ছি। আমি কখনোই ধৈর্ষহারা হইনি। উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়ায় বর্তমানে চাকুরী ক্ষেত্রে আমি ভাল পদে অবস্থানরত। সর্বপরি আমার সংসারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা। শিক্ষা, সাহসিকতা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তিই আমাকে আজকে এই জায়গায় দাড় করিয়েছে। আশাবাদী যে,এল,এল,বি পাশ করে নির্ধারিত নিয়মে উকালতি পেশায় নিয়োজিত হয়ে সমাজের মানুষের সেবা করবে এবং আমার সন্তানদেরকের সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলব । #

(৪) পঞ্চগড় সদর উপজেলার ডোকোরপাড়া মহল্লার মনিরা পারভীনের জীবন সংগ্রামের কাহিনী
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী ঃ যশোরে জম্ম লাভকারিনী মনিরা পারভীন বৈবাহিক কারণে ১৯৮৫ সাল থেকে পঞ্চগড়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে আসছেন। তিনি বর্তমানে পঞ্চগড় জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পঞ্চগড় ধাক্কামারা ইউনিয়ন সংলগ্ন ডোকোরোপাড়া পৌর এলাকার মিঠাপুকুর গ্রামের ১৫০ জন অনগ্রসর মহিলাকে সংগঠিত করে ১৯৮৭ সালে অগ্রণী মহিলা উন্নয়ন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা সভা নেত্রী হিসাবে নিদিষ্ট এলাকার গরীব দুখি কর্মজীবি,সাইডে বাসা বাড়িতে কাজ করা শ্রমজীবি মহিলাদের জীবন মান উন্নয়নে প্রত্যেক বাড়িতে মান সম্পন্ন স্যানিটেশন ব্যবস্থা,টিউবওয়েল স্থাপন,মহিলাদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে হাসপাতাল ক্লিনিক ইত্যাদিতে চিকিৎসা সুবিধা প্রাপ্তি বিষয়ে ব্যাপক গণ সচেতনা মুলক কাজ করেন। তাঁর এই সমিতি ২০০৩ সালে মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিন পঞ্চগড় জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্তি হয় যার নং-৪০/২০০৩ পজেমবিককা। পাশাপাশি মহিলাদের সঞ্চয়ী হতে অনুপ্রেরণা দিতে প্রতিষ্ঠা করেন অগ্রণী মহিলা সঞ্চয় সমিতি। এছাড়াও মনিরা পারভীন তার সমিতির উদ্যোগে যৌতুক বিরোধী সমাবেশ,উঠান বৈঠক,মানববন্ধন,আলোচনা সভা,অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অল্প বয়সী মেয়েদের বিবাহ ঠেকাতে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। তিনি তার সমিতির উদ্যোগে বিনা খরচে অনগ্রসর মহিলাদের সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২০১৬ সালের শ্রেষ্ঠ উদ্যোগী মহিলা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন গণসাহায্য সংস্থার পঞ্চগড় নারী ফোরামের সভাপতি হিসাবে ও জাতীয় চিকিৎসা কর্মসুচী প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসাবে ও পঞ্চগড় সদর হাসপাতালের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসাবে অনগ্রসর মহিলাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তিতে প্রত্যক্ষ ভুমিকা পালন করেন। মিঠাপুকুর বেসকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে মনিরা পারভীন মেয়ে শিশুদের স্কুলগামী করতে ব্যাপক কাউন্সেলিং এর মাধ্য,েউদ্ধুদ্বকরণ কর্মসুচী তথা মানববন্ধন আলোচনা সভার আয়োজন কওে গণ সচেতনার সৃৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করেন।
১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড় জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালনকালে মনিরা পারভীন মহিলাদের ক্রীড়া উন্নয়নে প্রশংসিত ভুমিকা পালন করেন এবং জেলার মেয়েদের নিয়ে জাতীয় ভিক্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরুস্কার লাভ করেন। তিনি গৃহহীন অসচ্ছল মহিলাদের সরকারী খাস জমি বরাদ্দ পেতে এবং প্রকৃতি মৎস্যজীবিদের জলমহাল প্রাপ্তিতে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন এই নারী ।#

(৫)পঞ্চগড় সদর উপজেলার পুরাতন মিলগেট এলাকার দিলারার জীবন সংগ্রামের কাহিনী
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী যে নারী ঃ দেলোয়ারা আক্তার দিলারা, পঞ্চগড় সদর উপজেলার পুরাতন মিলগেট এলাকার দরিদ্র পিতা মৃত আলী আহম্মদ,মা ফাতেমা বিবি‘র ঘরে জম্ম গ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে হঠাৎ পঙ্গু হয়ে পড়েন বাবা। তিনি চলাফেরা করতে পারতেন না। আমি তখন নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ১৯৯৮ সালে আমার বাবা মৃত্যু বরণ করেন। বাবাকে হারিয়ে আমি মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়ি। আমরা ৫ বোন ১ ভাই হয়ে গেলাম এতিম। বড় ৩ বোন বড় ভাইয়ের বিয়ের পর তারা সবাই পৃথক হয়ে যায়। বিধবা মা ও ছোট বোনকে নিয়ে আমার জীবন যাত্রা শুরু হয়। অভাবের কারণে নিজের লেখা-পড়া চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে শুরু করি টিউশনি। এভাবে অনেক কষ্ট করে ১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হলাম। লেখা-পড়া বন্ধ হয়ে গেল। তারপর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর পঞ্চগড় থেকে সেলাই ও দর্জি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। তখন অনাহারে অর্ধাহারে আমার বিধবা মা ও ছোট বোন কে নিয়ে এক হতাশার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত হতে লাগলো। আমার অভিভাবক না থাকায় আমাকে মানুষের অনেক বাজে কথা সহ্য করতে হয়। ২০০২ সালে আমার হয়ে গেল। বিয়ের পর নববধু হয়ে চলে গেলাম স্বামী দেলোয়ার হোসেন দিলুর বাসায়। স্বামীর বাড়িতে এসেও কোন সুখ শান্তি হলো না। আর্থিক অভাব অনটন আমার যেন নিয়তির কালো অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়। আমার স্বামী ছিলো বেকার। সংসার জীবনে এক সন্তানের মা হলাম। পাশাপাশি সেলাই মেশিন ক্রয় করে সেলাইয়ের কাজ শুরু করলাম। ফলে ধীরে ধীরে আর্থিক সফলতা আসতে থাকে। তারপর ছোট বোনকে বিয়ে দিলাম। দীর্ঘদিন সেলাই কাজ চালিয়ে গেলাম। ফলে পুর্বে ও তুলনায় আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগলো। ২০১২ সালে আবার নতুন করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধিনে ২০১২ সালে এস এস সি ও ২০১৪ সালে এইচ এস সি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃত্তিত্বের সহিত উর্ত্তীণ হলাম। সংসার জীবনে স্বামীর অবহেলা সত্বে ও আমি নিজের কর্ম ও লক্ষ্য অর্জনে হাল ছেড়ে দেইনি। আমি নিজেই ছোট একটি দোকান ঘর ভারা নিয়ে সেলাই কাজ শুরু করি। সেখান থেকে আর্থিক অবস্থার পরির্বতন শুরু হয়। এর পর বিউটি পার্লারের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। শেয়ারে আমি একটি বিউটি পার্লারে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি। এরপর নিজে আমি শহরের ধাক্কামার এলাকায় একটি বিউটি পার্লার ও একটি বুটিক হাউজ খুলি। বর্তমানে আমি তিনটি দোকান পরিচালনা করছি। আমার এ দোকান গুলোতে প্রায় কয়েকজন কর্মচারী কাজ করছে। আমি বর্তমানে বি,এ শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। দোকানের আয় দিয়ে বেশ কিছু জমি ক্রয় করেছি। নিজের বাড়িতে বিধবা মা‘কে রেখে সেবাযতœ ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। শুধু তাই নয় আমার এক মাত্র বড় ভাই। ২০১৬ সালে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। ভাইয়ের পরিবারের সবাইকে আমার কাছে রেখে তাদের ভরণ পোষন সহ পড়া-লেখার সব খরচ চালাচ্ছি। নিজের মেধা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে আমি আর্থিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পেরেছি। এদিকে ২০১১ সালে হিমালয় মহিলা উন্নয়ন সমিতি” নামে একটি সংগঠন তৈরী করি যা পঞ্চগড় মহিলা বিষষক অধিদপ্তর কৃতক রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত হয়েছি। এই সমিতির মাধ্যমে গ্রামের বহু দরিদ্র মহিলাদেরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে পঞ্চগড় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের থেকে হস্ত ও কুটি শিল্প বিষয়ে ৬ (ছয়) মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে আমি সমিতি ও দোকানের কার্যক্রম ব্যপকভাবে বৃদ্ধি করতে পেরেছি। হত দরিদ্র মহিলাদের নিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করছি। তাদের মাধ্যমে অনেক মহিলাদের হাতে তৈরী বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে। একজন নারী হয়েও আর্থিকভাবে সফলতা অর্জন করতে পেরে আমি মহান আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করছি।

হারিয়ে গেছে বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসর ‘বিশুয়া’

এমরান আল আমিন, সম্পাদক মন্ডলির সভাপতি, আজকের রিপোর্ট ডট কম :

হাজার বছরের পুরোনো আবহমান বাংলারি ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বিশুয়া’ হারিয়ে গেছে। বাংলা সালের শেষ দিনটি অথ্যাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি বিশুয়া উৎসব হিসাবে পালিত হতো। ‍বিশুয়া একটি সার্বজনীয় উৎসব ছিল। অপরিকল্পিত বন জঙ্গল নিধন, নগর জীবনের আধৃনিয়কার ছোয়া, জনংসংখ্যা বৃদ্ধি কারণে হারিয়ে গেছে বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বিশুয়া।আবহমান কাল হতে এই এলাকার মানুষ ধর্ম বর্ণ, ধনী গরীব, দলমত, ছোট বড় নির্বিশেষে সবাই মিলে কোন ধরনের বিতর্ক ছাড়া, ঝগড়া ফ্যাসাদ ছাড়া নির্বিঘ্নে সবাই একসাথে মিলে বাংলা সালের এই শেষ দিনটিকে নির্মল আনন্দ উপভোগ করত।

বঙ্গাব্দের গত শতাব্দিতেও আমাদের ছোট বেলাতে আমরা এই উৎসবে শরিক হয়েছি। এই দিনটি খুবই ধুম ধুামের সাথে পালিত হতো। এই দিনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিকভাবে অনুষ্ঠান ছিল। আমরা ছোটবেলায় ঘুম থেকে উঠেই ছোলা, চাল, কালাই, চাল-পয়রার ছাতুর সাথে নিম পাতা মিশিয়ে খাওয়া পরিবারের সকল সদস্যের জন্য আবিশ্যক ছিল। তারপর ছোটবড় পাড়ার সবাই মিলে হাতে লাঠি বাটুল আর বাশের কঞ্জি, মহাজন ফলের আঠা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ তৈরী করে দল বেধে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম শিকারের আশায়। বক, চিল, শালিক, ঘুঘু, রাতচোড়া, খরগোস শিকার করার চেষ্টা করতাম সবাই মিলে। কউ শিকার করতে পারোতা কউ পারত না।শিকার পেলেও খূশি না পেলেও খুশি।

দুপুরের পরে বাসায় ফিরে ছোটবড় সবাই মিলে নিমপাতা পানির সাথে গরম করে সেই পানি দিয়ে গোসল করতাম। কোনরকমে দুপুরের খাবার শেরে গোয়ল ঘরের ভিতর দরজা বন্ধ করে ক্ষির রান্না করে খেতাম। আর কেউ কেউ বাইরের থেকে পানি ছিটাতো। বিকেলে লাঠি খেলা, পাখি খেলা হতো। রাতে পাড়ার ছেলেরা সবাই মিলে বনভোজন খেতাম। সবার বাড়ীতেই রাতের বেলা খুব ভালো রান্না হতো। সারাবছরের ধারাবাতিকতা রক্ষা করার জন্য। শেষ দিনটিতেউ ভাল খাবার খেত সেই লক্ষ্যে। ভাত বেশি করে রান্না করা হতো, যা পরের দিন পহেলা বৈশাখে পান্তা হিসাবে পিয়াজ, কাঁচা মরিচ, শুটকি ভর্তা, শিদল ভর্তা, আলুর ভর্তা দিয়ে মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তৃপ্তির সাথে খেত।

নববর্ষে বাঙ্গালীদের কালক্রমে এটা পরিবর্তিত হয়ে পান্তা ইলিশে রুপ নিয়েছে আর হারিয়ে গেছে বিশুয়া উৎসব। বিশুয়া উৎসব নিয়ে মুরুব্বিতের কাছে হরিণ শিকারের গল্পও শুনেছি। একদা আমার বাবার দাদা ডাঃ রহমতউল্লাহ কোন বিশুয়ায় হরিণ শিকার করেছিলেন আনুমানিক শত বছর আগে। সেই হরিণের শিং আজ ও আমাদের ঘরে শোভা পাচ্ছে। ছোটবেলায় শুনেছি বিশুয়ার দিনে ডোমপাড়ার জঙ্গলে বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার জমাদারপাড়া জনৈক হাফিজুল।

বাংলা ভাষার বয়স যতদুর জানা যায়,প্রায় দেড় হাজার বছরের কাছাকাছি, আর এ ভুখন্ডের মানুষ একই সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির স্বপ্ন, ভাষা চর্চা আর বাঙালি সংস্কৃতিও লালন করে আসছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৪৭ বছর আগে। কিন্ত এ জাতি বাংলা ভাষা ভিত্তিক একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন করার প্রত্যাশায় তার অর্জিত সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে ছিল নানান প্রতিকুলতা সত্ত্বেও।এই জাতি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার দেশি -বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে,জীবন বিসর্জন দিয়ে গোটা পৃথিবী ব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর সেই কারনে দুনিয়াতে অনেক ভাষা হারিয়ে গেলেও বাংলা ভাষা তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সহ চলমান আন্তর্জাতিক পরিসরে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত ছিল, তেমনি তাকে রক্ষা করবার জন্য আঁকড়ে ধরবার জন্য নিজস্ব প্রতিরোধও ছিল সবসময়। আজকের অবাধ তথ্য-প্রবাহের যুগেও যেখানে নানান চ্যানেলে ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি গানের উম্মাদনার বিপরিতে অনেক মানুষ রবীন্দ্র সংগীত, লালনগীতি, ভুপেন হাজারিকার গান, নজরুলগীতি শোনে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা একটি শক্তি হিসাবে কাজ করেছিল। যেমন, বিশুয়া,নববর্ষ, নবান্ন প্রভৃতি অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি গোষ্ঠীর ঐক্য দিনে দিনে সুদৃঢ় হয়েছিল। কালক্রমে এখন বিশুয়া উৎসব কল্পকাহিনী।